রেমিট্যান্স কী এবং এর গুরুত্ব। What is Remittance My Classroom

রেমিট্যান্স বলতে বোঝায় প্রবাসে কর্মরত ব্যক্তিদের দ্বারা তাদের নিজ দেশে পাঠানো অর্থ। সাধারণত প্রবাসীরা পরিবারের জীবিকা নির্বাহ এবং উন্নত জীবনের জন্য এই অর্থ পাঠান। তবে এটি শুধু ব্যক্তি বা পরিবারের জন্য নয়, বরং দেশের অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রেমিট্যান্সের মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলিতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি পায়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং দারিদ্র্য বিমোচনে সহায়তা করে।
রেমিট্যান্সে প্রণোদনা কী
রেমিট্যান্সে প্রণোদনা বলতে বোঝায় সরকার কর্তৃক প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের উপর প্রদত্ত আর্থিক সহায়তা। এই প্রণোদনার মূল উদ্দেশ্য হলো বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানোকে উৎসাহিত করা এবং দেশের অর্থনীতিতে এর অবদান বৃদ্ধি করা। প্রণোদনার হার নির্ধারণ করে সরকার, যা সময়ে সময়ে পরিবর্তিত হয়।
রেমিট্যান্সে প্রণোদনার হার
বাংলাদেশে বর্তমানে রেমিট্যান্সে প্রণোদনার হার ২.৫%। অর্থাৎ, একজন প্রবাসী যদি ১০০ ডলার পাঠান, তাহলে তিনি অতিরিক্ত ২.৫ ডলার পাবেন। সম্প্রতি এই হার ৫% বাড়ানোর ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে এখন থেকে ১০০ ডলারের বিপরীতে ১০৫ ডলার পাওয়া যাবে।
এই প্রণোদনার ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২২-২৩ অর্থবছরে রেমিট্যান্সের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৪.৬৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
রেমিট্যান্সে প্রণোদনার সুবিধাসমূহ
১. বৈধ পথে অর্থ পাঠানোর প্রবণতা বৃদ্ধি
প্রণোদনার ফলে প্রবাসীরা বৈধ চ্যানেলের মাধ্যমে অর্থ পাঠাতে উৎসাহিত হন। এতে হুন্ডি বা অবৈধ উপায়ে অর্থ পাঠানোর হার কমে।
২. বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি
রেমিট্যান্সের মাধ্যমে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি পায়। এটি দেশের আমদানি-রপ্তানি খাতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
৩. দারিদ্র্য বিমোচন
গ্রামীণ এলাকায় প্রবাসী আয়ের একটি বড় অংশ ব্যবহৃত হয়। ফলে পরিবারগুলোর আর্থিক অবস্থা উন্নত হয় এবং দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব হয়।
৪. কর্মসংস্থান সৃষ্টি
রেমিট্যান্সের অর্থ স্থানীয় অর্থনীতিতে বিনিয়োগ করার ফলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। বিশেষত ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে এর প্রভাব উল্লেখযোগ্য।
৫. অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা
রেমিট্যান্স দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আনে এবং বৈদেশিক বাণিজ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করে।
বর্তমান প্রেক্ষাপট
বর্তমানে প্রবাসী আয়ে প্রতি ডলারের বিনিময়ে ব্যাংকে ১১০ টাকা ৫০ পয়সা দেওয়া হয়। এর সঙ্গে সরকার ২.৫% প্রণোদনা দেয়, যা এক ডলারের জন্য মোট ১১৩ টাকা ২৬ পয়সা। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ব্যাংকগুলো আরও ২.৫% যোগ করবে। ফলে এখন থেকে প্রতি ডলারের বিনিময়ে প্রবাসীরা পাবেন ১১৬ টাকার কিছু বেশি।
ডলার সংকট ও তার প্রভাব
বাংলাদেশের ডলার বাজারে দীর্ঘদিন ধরে অস্থিরতা চলছে। ডলারের দাম ব্যাংকে ১১৫-১১৬ টাকা এবং খোলা বাজারে ১২০ টাকায় পৌঁছেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার সংকট মোকাবিলায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ডলার সরবরাহ করছে। তবে এতে রিজার্ভের পরিমাণ ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে।
অক্টোবর মাসের প্রথম ১৩ দিনে দেশে ৭৮ কোটি ১২ লাখ ৩০ হাজার ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে। এর বাংলাদেশি মুদ্রায় মূল্য প্রায় ৮ হাজার ৫৫৪ কোটি টাকা। তবে মাস শেষে রেমিট্যান্সের পরিমাণ ১৮৬ কোটি ডলার বা ১.৮৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
রিজার্ভ হ্রাসের চিত্র
ডলার সংকটের কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ প্রতিনিয়ত হ্রাস পাচ্ছে। গত এক সপ্তাহে রিজার্ভ প্রায় ১১ কোটি ডলার কমে ২১ বিলিয়নের নিচে নেমে গেছে। এটি দেশের অর্থনীতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
উপসংহার
রেমিট্যান্স উন্নয়নশীল দেশগুলির অর্থনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ে নয়, বরং সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। রেমিট্যান্সে প্রণোদনা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত প্রবাসীদের বৈধ পথে অর্থ পাঠাতে আরও উৎসাহিত করবে এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াতে সহায়ক হবে। তবে ডলার সংকট মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।
